রোডম্যাপেই বন্দি 'সেকেন্ড ওয়েভ' ঠেকানোর প্রস্তুতি

রোডম্যাপেই বন্দি 'সেকেন্ড ওয়েভ' ঠেকানোর প্রস্তুতি
ছবি : সংগৃহীত

আসন্ন শীত মৌসুমে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ (সেকেন্ড ওয়েভ) আসতে পারে- জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার পর তা মোকাবিলায় গত সেপ্টেম্বরে এর রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। তবে তা কার্যত নথিবন্দি হয়ে আছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রথমবারের মতো এবারও আগাম প্রস্তুতি নাজুক হলে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ সামলানো কঠিন হবে। সংক্রমণের সঙ্গে পালস্না দিয়ে মৃতু্যর সংখ্যাও বাড়বে। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার বিশাল ফারাক রয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ চিত্র পর্যালোচনা করে বিষয়টি ষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার রোডম্যাপে দেশের প্রতিটি জেলায় একাধিক পরীক্ষাগারে আরটিপিসিআর মেশিনে পরীক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশের ৩৬ জেলায় এখনো একটি আরটিপিসিআর মেশিন বসেনি। এমনকি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। ফলে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ লাগলে এসব এলাকার বাসিন্দাদের নমুনা পরীক্ষার জন্য অন্য জেলার আরটিপিসিআর পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে, যা সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, যে ৩৬ জেলায় আরটিপিসিআর মেশিন নেই, সেসব জেলায় আগে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু করা হবে। ফলে নমুনা পরীক্ষা নিয়ে সেখানে যে সংকট রয়েছে তা কেটে যাবে। এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দীর্ঘদিন পরও সেখানে অ্যান্টিজেন টেস্ট চালু না হওয়ায় সময়মতো এ 'সাপোর্ট' পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান।

তারা জানান, গত ১৭ সেপ্টেম্বর অ্যান্টিজেন টেস্ট চালুর অনুমোদন দেয় সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে আরটিপিসিআর পরীক্ষাগার না থাকা ৩৬ জেলা এবং ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও মিটফোর্ডসহ দেশের সরকারি আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ যে কিট দিয়ে এ পরীক্ষা করা হবে, সে কিটগুলোর ভ্যালিডেশন পরীক্ষাও (ডেটার শুদ্ধতা নির্ণয়) এখনো অসম্পন্ন। এরপর তা কেনার বিষয় তো রয়েই গেছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু নিয়ে প্রায় চার মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে ঠেলাঠেলি চলছে। তাই এ কার্যক্রম সময়মতো শুরু হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। অথচ সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় এ ইসু্যটিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার রোডম্যাপে ১৫টি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে ঠান্ডাজনিত রোগ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা, ভ্যাকসিন, ওষুধ এবং করোনা চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ রয়েছে। অথচ শীত ঘনিয়ে এলেও বাজারে ঠান্ডাজনিত রোগের টিকা-ভ্যাকসিন কোনোটিরই পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। যদিও বিভিন্ন ফার্মেসিতে অ্যামেরিকা ও ফ্রান্সের তৈরি ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিমোনিয়ার ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। এর দাম আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা হওয়ায় নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এ ভ্যাকসিন দেওয়া অনেকটাই অসম্ভব। এছাড়া করোনার মাঝারি ও গুরুতর উপসর্গে ব্যবহৃত ওষুধের দাম আগের মতোই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার এ দুটি ইসু্যতে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার খবর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।

এদিকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার, নমুনা পরীক্ষা ও গুরুতর অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা, স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোরতা প্রদর্শন এবং জনসমাগম এড়াতে পিকনিকসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এড়ানোর বিষয়গুলো সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে আগাম কোনো প্রস্তুতি নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ক্ষেত্রে সফলতা দেখাতে ইতোপূর্বে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা দেখা গেছে। মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু করা হলেও উদ্যোগটি শতভাগ কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে নমুনা পরীক্ষা ও প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে সরকার সাধারণ মানুষকে খুব একটা আস্থাশীল করতে পারেনি। সে কারণে সরকারি-বেসরকারি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের শয্যা খালি থাকছে। সর্বোপরি দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বিশ্লেষণ করলেই এক্ষেত্রে আস্থাহীনতার চিত্র ফুটে উঠবে।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে দেশের বাজারে নিয়ে আসার বিষয়টি সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলার রোডম্যাপিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেলেও এ ব্যাপারে সরকারের প্রস্তুতি কতটা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসে টিকা নিয়ে যে নয়টি কোম্পানির পরীক্ষা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তাদের অন্তত পাঁচটির সঙ্গে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রস্তুতিসহ সব কার্যক্রম চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে।

আই বি এম/আওয়াজবিডি


অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
https://www.awaazbd.news/author/awaazbdonlinenews

অনলাইন ডেস্ক

mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ